ঢাকা, বাংলাদেশ | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, সোমবার

ফিরে দেখা-২০১৫

অর্থনীতির সূচকে বিরাজ করছে স্বস্তি

বিশেষ প্রতিনিধি:

| প্রকাশিত হয়েছে: December ৩০, ২০১৫: ৭ টা ৫৭ মিনিটে

রাজনৈতিক অস্থিরতার পরও ২০১৫ সালে দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতের সূচকে উন্নতি হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, রেমিট্যান্স, রিজার্ভসহ অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক ‘বাংলাদেশ ইকোনমি ২০১৫ : পারফরম্যান্স অ্যান্ড আউটলুক’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
এতে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সময়োচিত উন্নয়নমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মকান্ডের কারণে দেশের আর্থিক খাতে সুস্থিতি বিরাজ করছে। এ কারণেই বিশ্বব্যাপী মন্দা ও জাতীয় নানা বাধার মাঝেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এ বছরসহ (২০১৫) গত ছয়-সাত বছর ধরে বেশ সাফল্যের ধারাতেই রয়েছে বাংলাদেশ। অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতের সূচকগুলোই বলে দিচ্ছে, বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করে চলেছে। দেশের আর্থিক খাতের পরিস্থিতিও সুস্থির ও শক্তিশালী রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়নের ‘রোল মডেল’ হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়ে উঠেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরো সুদৃঢ় ও স্থিতিশীল হবে এবং সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশ আরো প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির নতুন পথে পরিচালিত হবে।

জিডিপি: ২০০৮-০৯ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৫.০৫ শতাংশ। সেখানে সর্বশেষ অর্থবছর ২০১৪-১৫ এর ৬.৫১ শতাংশসহ গত ছয় অর্থবছরে গড়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬.২ শতাংশ। বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি মন্দার পরিবেশেও অব্যাহতভাবে গড়ে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। এ ধরনের প্রবৃদ্ধি বিশ্বেও বিরল।

মূল্যস্ফীতি: বাংলাদেশ ব্যাংক বিচক্ষণ মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতির হারকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ইতোমধ্যেই এতে সাফল্য এসেছে। ২০১১ এর পর থেকে মূল্যস্ফীতির হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ডিসেম্বর ২০১৪ ও জুন ২০১৫ এর যথাক্রমে ৬.৯৯ ও ৬.৪ শতাংশ থেকে আরো কমে নভেম্বর ২০১৫ শেষে ৬.২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা সন্তোষজনক ও সহনীয়। এই অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির উত্থান-পতন সর্বনিম্নÑযা বিদেশি বিনিয়োগকারী আকর্ষণে সামষ্টিক স্থিতিশীলতার শক্তিশালী ভিতের পরিচায়ক।

আমদানি: ২০০৮-০৯ অর্থবছরে মোট আমদানি ব্যয় হয়েছিল ২২.৫ বিলিয়ন ডলার, সেখানে গত অর্থবছরে আমদানি ব্যয় হয়েছে ৪০.৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১১.৩ শতাংশ বেশি। বছরের শেষভাগে এসে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ঊর্ধ্বমুখী ধারা সামনের দিনগুলোতে উৎপাদন বাড়ানোর শক্ত পাটাতন তৈরি করতে সাহায্য করেছে। নভেম্বর ২০১৫ মাসে এলসি খোলা ও স্যাটেলমেন্ট গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে যথাক্রমে ২৩.৯ ও ৫.৮ শতাংশ।

রপ্তানি: ২০০৮-০৯ অর্থবছরে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ১৫.৬ বিলিয়ন ডলার, সেখানে গত অর্থবছরে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ৩১.২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩.৪ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রপ্তানি আয় হয়েছে ১২.৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৬.৭ শতাংশ বেশি।

রেমিট্যান্স: ২০০৮-০৯ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল ৯.৭ বিলিয়ন ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রেকর্ড ১৫.৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ৬.২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের সমান। বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা প্রণোদনা ও প্রচারণা, রেমিট্যান্স বিতরণের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও প্রদান পদ্ধতি সহজ ও গতিশীল করা এবং স্থিতিশীল টাকার মূল্য রেমিট্যান্সে সাফল্য ধরে রাখতে অবদান রেখে চলেছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ: ২০০৮-০৯ অর্থবছর শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৭.৫ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে (২০ ডিসেম্বর ২০১৫) তা সাড়ে তিনগুণের বেশি বেড়ে ২৭.৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা দিয়ে দেশের আট মাসের মতো আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নে জোরালো ভূমিকা রাখছে। বৈদেশিক অর্থনৈতিক খাতের এই শক্তির জোরেই বর্তমান সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করে চলেছে।

টাকার বিনিময় হার: টাকার মূল্যমান দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ও উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশগুলোর মুদ্রার তুলনায় অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল ও জোরালো অবস্থানে রয়েছে। সর্বশেষ ২০ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে ডলার-টাকার গড় বিনিময় হার ছিল ৭৮.৭০ টাকা।

মাথাপিছু আয়: বিবিএস’র সর্বশেষ তথ্য মতে, গত অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ১৩১৪ ডলার। ২০১৩-১৪ অর্থবছর শেষে মাথাপিছু আয় ছিল ১০৪৪ ডলার।

ব্যাংকিং খাত
ব্যাংকিং খাত এখন অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও রেসিলিয়েন্ট বা ঝুঁকিসহনে সক্ষম। ব্যাংকিং খাতের সূচকগুলো দিন দিনই শক্তিশালী হচ্ছে।
মূলধন পর্যাপ্ততা: ব্যাংকিং খাত শক্তিশালী কিনা তার অন্যতম পরিমাপক হচ্ছে মূলধন পর্যাপ্ততা। ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা সংক্রান্ত ব্যাসেল-২ নীতিমালার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের পর এ বছর (২০১৫) থেকেই ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়ন করার পথ-নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে। এর আওতায় জুন ২০১৫ শেষে মূলধন পর্যাপ্ততার হার ছিল ১০.২৭ শতাংশ। সেপ্টেম্বর শেষে এ হার দাঁড়িয়েছে ১০.৫৩ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিক মানদ- ৮ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি।

আমানত ও ঋণ: অক্টোবর ২০১৫ শেষে ব্যাংকিং খাতে আমানত ১৩.৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭,২৫,৮৬০ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫,৭০,৬২০ কোটি। ঋণের প্রবৃদ্ধি ১১.৫ শতাংশ।

শ্রেণীকৃত ঋণ: নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও খেলাপি ঋণের হার এক অংকের নিচে রাখা সম্ভব হয়েছে। ডিসেম্বর ২০১৪ ও মার্চ ২০১৫ শেষে শ্রেণীকৃত ঋণের হার ছিল যথাক্রমে ৯.৬৯ ও ১০.৪৭ শতাংশ। জুন ২০১৫ শেষে শ্রেণীকৃত ঋণের হার কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ৯.৬৭ শতাংশ। খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন কভারেজ ৯৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

কলমানি সুদের হার: আন্ত:ব্যাংক কলমানি রেট দীর্ঘদিন ধরে ৫ শতাংশের নিচে/কাছাকাছি অবস্থান করছে। ২০ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে কলমানি সুদের গড় হার ছিল ৪.০৭ শতাংশÑযা ব্যাংকিং খাতে পর্যাপ্ত তারল্য, স্থিতিশীল মুদ্রাবাজার ও সুশাসন উন্নয়নের পরিচায়ক।

সুদহারের স্প্রেড: আমানত ও ঋণের সুদহার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিবিড় নজরদারি এবং ব্যাংকগুলোর ওপর নৈতিক চাপ অব্যাহত রাখায় আমানত ও ঋণের গড় সুদহার কমে অক্টোবর ২০১৫ শেষে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৬.৫৮ ও ১১.৩৫ শতাংশ। আমানত ও ঋণের সুদহারের স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৪.৭৭ শতাংশ। এই স্প্রেড মূল্যস্ফীতি নিম্নগামী হওয়ার সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে ও ক্রমান্বয়ে কমছে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি
বাংলাদেশ ব্যাংক অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন বিশেষ করে কৃষি, এসএমই ও পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন বাড়ানোর কৌশল ও নিম্নআয়ের মানুষদের আর্থিক সেবায় অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রম গ্রহণ অব্যাহত রেখেছে। এর ফলে দেশের ভিতরে চাহিদা বেড়েছে| যা প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করছে।

দশ টাকার অ্যাকাউন্ট: আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অংশ হিসেবে কৃষক ও গরিব মানুষের দশ টাকায় ব্যাংক হিসাব সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১.৬৪ কোটি, যার বেশিরভাগই কৃষকের। কৃষকদের সরকার প্রদত্ত ভর্তুকি ও ব্যাংক প্রদত্ত কৃষি ঋণ এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। এছাড়া, সামাজিক নিরাপত্তার ভাতাভোগী দরিদ্র মানুষ ও অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা, পোশাক শিল্প ও সিটি কর্পোরেশনের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেয়া হয় তাদের নামে খোলা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক পুন:অর্থায়ন তহবিল: কৃষক ও হতদরিদ্রদের দশ টাকার হিসাব সচল রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব উৎস থেকে ২০০ কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন রয়েছে। এ তহবিল থেকে এ পর্যন্ত ৪২,৩১০ জন হিসাবধারীকে ২৫ কোটি টাকা অর্থায়ন করা হয়েছে।

স্কুল ব্যাংকিং: স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতায় ৫৬টি ব্যাংকে ১০ লক্ষাধিক স্কুল ছাত্র-ছাত্রী ব্যাংক হিসাব খুলেছে। এসব হিসাবে জমার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৬৫ কোটি টাকা।

পথশিশুদের ব্যাংক হিসাব: বাংলাদেশ ব্যাংক ভাগ্যবিড়ম্বিত কর্মজীবী পথশিশুদের ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা করেছে। এ পর্যন্ত ২৪১৩ জন কর্মজীবী পথশিশু ব্যাংক হিসাব খুলেছে। এসব হিসাবে জমার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ কোটি টাকা।

কৃষি খাত
দেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব বিবেচনা এবং এ খাতের উন্নয়নে সরকারের উদ্যোগের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবছর কৃষি ঋণ নীতিমালা প্রণয়নসহ কৃষকবান্ধব নানা উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। দেশি-বিদেশি সব ব্যাংককেই এখন কৃষি খাতে ঋণ দিতে হয়, কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে হয়।

কৃষি ঋণ: গত অর্থবছরে কৃষি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ১৬,০৩৭ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬,৪০০ কোটি টাকা, যার বিপরীতে অক্টোবর ২০১৫ পর্যন্ত বিতরণ ৪৬৩১ কোটি টাকা বা ২৮ শতাংশ।

বর্গাচাষি ঋণ: আগে বর্গাচাষিরা ব্যাংক ঋণ পেতো না। এ উপেক্ষিত বর্গাচাষিদের দোরগোড়ায় সহজ শর্তে কৃষি ঋণ পৌঁছে দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৯ সালে ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ ঋণ প্রকল্প গ্রহণ করে, যা দেশের একটি বৃহৎ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় গত ছয় বছরে ১১ লাখ ৪০ হাজার বর্গাচাষিকে ২১০০ কোটি টাকার বেশি অর্থায়ন করা হয়েছে।

বিশেষ ফসল চাষে রেয়াতি সুদে ঋণ: গত পাঁচ অর্থবছরে আমদানি নির্ভর বিশেষ ফসল (আদা, রসুন, পেঁয়াজ, মরিচ, হলুদ ইত্যাদি) চাষে রেয়াতি সুদহারে ব্যাংকগুলো কৃষক পর্যায়ে ৩৮৭ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে।

এসএমই খাত
নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতে অর্থায়নের ওপর জোর দিয়েছে।

এসএমই ঋণ: গত প্রায় ছয় বছরে (২০১০Ñসেপ্টেম্বর ২০১৫) ব্যাংকগুলো প্রায় ৩০ লাখ উদ্যোক্তাকে ৪ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা এসএমই ঋণ বিতরণ করেছে, যার মধ্যে নারী উদ্যোক্তাদের দেয়া হয়েছে ১৫,৮৮৯ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে এসএমই ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১,০৪,৫৮৬ কোটি টাকা, যার মধ্যে সেপ্টেম্বর ২০১৫ পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে ৮১,৯৫৪ কোটি টাকা বা ৭৮ শতাংশ।

এসএমই পুনঃঅর্থায়ন তহবিল: এসএমই খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল, আইডিএ, এডিবি ও জাইকার অর্থায়নে ২১০০ কোটি টাকার বেশ কয়েকটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল চালু করা হয়েছে। ২০১৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৪৯,২৯৮ জন উদ্যোক্তাকে ৫০৮৯ কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন করা হয়েছে।

নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ সুবিধা: এসএমই খাতের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের ১৫ শতাংশ অর্থ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণদানে ব্যাংকগুলো অনেক বেশি মনোযোগী হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৪,১৩৩ জন নারী উদ্যোক্তা ১৩৭৬ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা পেয়েছে।

নতুন উদ্যোক্তা অর্থায়ন: এসএমই খাত উন্নয়ন প্রচেষ্টায় সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী উদ্যোগে নতুন উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক সবসময়ই প্রাধান্য দিয়ে আসছে। এই সময়ে দেশের প্রায় ২.৭ লাখ নতুন উদ্যোক্তাকে ৫১ হাজার কোটি টাকা এসএমই ঋণ দেয়া হয়েছে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে ডিসিসিআই’র সহায়তায় ১০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল চালু রয়েছে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি: বাংলাদেশের মত অধিক জনসংখ্যার একটি দেশে কর্মসংস্থান একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে অব্যাহত অর্থায়ন ও নতুন নতুন উদ্যোক্তাকে ব্যাংক অর্থায়নের আওতায় আনা হয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত এমএসএমই খাতে ১৫ লাখের বেশি নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে।

গ্রিন ব্যাংকিং
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলা ও বাংলাদেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গ্রিন ব্যাংকিং ধারণা চালু করা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ¦ালানি ও পরিবেশবান্ধব অর্থায়নযোগ্য খাতে চালুকৃত ২০০ কোটি টাকার আবর্তনশীল পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে এ পর্যন্ত ২০১ কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব ইটভাটা স্থাপনে এডিবি’র অর্থায়নে ৪০০ কোটি টাকার আরেকটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। এ তহবিল থেকে এখন পর্যন্ত ৫টি ব্যাংকের মাধ্যমে ৮টি প্রতিষ্ঠানকে ১২৫ কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন করা হয়েছে।

সিএসআর
২০০৯ সাল থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের মূলধারায় সিএসআর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ হাতে নেয়। গত ছয় বছরের ব্যবধানে ব্যাংকিং খাতে সিএসআর ব্যয় ৫৫ কোটি টাকা থেকে প্রায় দশগুণ বেড়ে ৫১১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফা থেকে সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে গঠিত ‘বাংলাদেশ ব্যাংক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল’ এর প্রতি বছরের বরাদ্দ ৫ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। সিএসআর এর আওতায় এ বছর ব্যাংকিং খাতে একটি আন্তর্জাতিক মানের সম্মিলিত হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।

মোবাইল ব্যাংকিং
কম খরচে ও দ্রুত টাকা পাঠানোর প্রযুক্তিনির্ভর সহজ সেবা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১০ সালের প্রথম দিকে ব্যাংকের নেতৃত্বাধীন মোবাইল ব্যাংকিং চালু করে। এ লক্ষ্যে ২০১১ এর ২২ সেপ্টেম্বর মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস সম্পর্কিত একটি বিস্তারিত গাইডলাইন জারি করে। দেশব্যাপী এ নতুন সেবার দ্রুত প্রসার ঘটেছে। ইতোমধ্যে ২৮টি ব্যাংককে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রদানের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং গ্রাহকের সংখ্যা এখন ৩১২ কোটি। ব্যাংকগুলো সাড়ে ৫ লক্ষাধিক এজেন্টের মাধ্যমে এ সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে।

এজেন্ট ব্যাংকিং
আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অভিযানকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিতে এজেন্ট ব্যাংকিং নীতিমালা প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই মধ্যে ৬টি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করেছে। দেশের আনাচে কানাচে ব্যাংকের অনুরূপ এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ব্যাংকিং কার্যক্রম আরো দ্রুত ও ব্যয় সাশ্রয়ী করবে বলে আশা করা যায়।

ব্যাংক ও শাখার সংখ্যা
জনগণের দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছাতে বর্তমানে ৫৬টি ব্যাংক ও ৩২টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যরত রয়েছে। অক্টোবর ২০১৫ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মোট শাখা দাঁড়িয়েছে ৯২১৯টি, যার মধ্যে ৫২৩৪টিই পল্লী শাখা। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শাখা রয়েছে ২১০টি।

গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ
ব্যাংকিং খাতের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ও সন্তুষ্টি বজায় রাখা, ব্যাংকিং সেবার মান সম্পর্কে গ্রাহকদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং উন্নততর গ্রাহক সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও সকল শাখা অফিসে ‘গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্র’ স্থাপন করা হয়। এই কেন্দ্রে ২০১২ সালে একটি পৃথক হটলাইন নম্বর ‘১৬২৩৬’ চালু করা হয়। ব্যাংকিং সেবার মানোন্নয়নে এ হটলাইনটি খুবই ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়েছে। এ বছর এই কেন্দ্রের কার্যক্রমের ওপর ৪র্থ বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। কেন্দ্রটি চালুর পর থেকে জুন ২০১৫ পর্যন্ত প্রায় পনের হাজার অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

ডিজিটাইজেশন
সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেকে ও দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ডিজিটাইজড করছে। বর্তমানে প্রায় নব্বই শতাংশ ব্যাংক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। অনলাইন সিআইবি, অটোমেটেড ক্লিয়ারিং হাউজ ও ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার ব্যবস্থা চালুর পর ব্যাংকিং লেনদেনে গতি বাড়াতে ‘রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস)’ সিস্টেম এ বছরই চালু করা হয়েছে। ই-ব্যাংকিং ও ই-কমার্স আরো প্রসারে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশের ভিতরে এখন দুই হাজারেরও বেশি ই-কমার্স কাজ করছে। ব্যাংকিং খাতের আর্থিক জালিয়াতি বন্ধ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারসহ নজরদারি আরো জোরদার করেছে।

বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সহজীকরণ
বিদেশে ভ্রমণ, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, চিকিৎসা ব্যয়, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা গ্রহণ, আমদানি-রপ্তানিসহ ব্যবসায়িক প্রয়োজন ইত্যাদির জন্য পূর্বানুমোদন গ্রহণের আবশ্যকতা প্রত্যাহার করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন বিদেশি নাগরিক ও অনিবাসী বাংলাদেশিরা অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোতে সহজেই এফসি হিসাব খুলতে ও পরিচালনা করতে পারেন। এই হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশ থেকে আনা এবং বিদেশেও পাঠানো সহজ করা হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আকার ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়েছে। এ তহবিল থেকে একক ঋণগ্রহীতার ঋণসীমা বাড়িয়ে ১৫ মিলিয়ন ডলার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বিদেশি পেশাজীবী বা বৈজ্ঞানিক সংস্থার সদস্য ফি, বিদেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিভিন্ন ফি, হোটেল বুকিং এবং অনলাইনে সফটওয়্যার, অ্যাপস, ই-বুকসহ অন্যান্য পণ্য ও সেবার মূল্য পরিশোধ সহজ করা হয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডধারী না হয়েও ‘ভারচুয়াল কার্ড’ ব্যবহার করে সাধারণ জনগণও বিদেশে এরূপ ফি অনলাইনে পরিশোধ করতে পারছেন।

সুপারভিশন জোরদারকরণ
ব্যাংকগুলোর শাখা ও ঊর্ধ্বতন কার্যালয় পর্যায়ের জালিয়াতির সম্ভাব্য প্রবণতা সনাক্ত করার জন্য ফরেন এক্সচেঞ্জ লেনদেন সংক্রান্ত ইলেকট্রনিক ড্যাশবোর্ড ও ইন্টিগ্রেটেড সুপারভিশন সিস্টেম প্রয়োগের মাধ্যমে সুপারভিশন জোরদার করা হয়েছে। যেসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে সেসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পর্ষদে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পর্যবেক্ষকের নিবিড় তদারকির কারণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন অনিয়ম-জালিয়াতির ফাঁক-ফোঁকর অনেকটাই বন্ধ হয়েছে। বেসিক ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ সংক্রান্ত অনিয়ম উদ্ঘাটনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক অভিযুক্তদের অপসারণ এবং পর্ষদ পুনর্গঠনের নির্দেশনা দিয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email