ঢাকা, বাংলাদেশ | ২২ অক্টোবর ২০২০, বৃহঃস্পতিবার

ফাঁসির অপেক্ষা, মঞ্চ প্রস্তুত

অর্থবার্তা ডেস্ক:

| প্রকাশিত হয়েছে: May ১০, ২০১৬: ১১ টা ২১ মিনিটে

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মতিউর রহমান নিজামীকে আদালতের রায় পড়ে শোনানো হয়েছে। সোমবার রাত সোয়া ৮টায় ডিআইজি প্রিজন গোলাম হায়দারের নেতৃতে কারাগারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তার কনডেম সেলে গিয়ে রিভিউ খারিজের রায় পড়েন। আইনি প্রক্রিয়ায় বাকি শুধু প্রাণভিক্ষার পর্ব। আসামির এ সংক্রান্ত আবেদন প্রত্যাখ্যান হলে যে কোনো সময় ফাঁসি কার্যকর করা হবে। এ লক্ষ্যে কারাগারে ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়েছে। তৈরি রাখা হয়েছে জল্লাদ। কেন্দ্রীয় কারাগার ঘিরে নেয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
৫ মে মৃত্যুদণ্ড বহালের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে নিজামীর রিভিউ আবেদন খারিজ হয়। রিভিউ খারিজের মধ্য দিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও তার ফাঁসির আদেশই বহাল থাকে। এখন মতিউর রহমান নিজামীর সামনে শুধু প্রাণভিক্ষার আবেদনটিই বাকি আছে। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন করতে পারবেন তিনি। এক্ষেত্রে কারাবিধি প্রযোজ্য না হওয়ায় তিনি ক্ষমা প্রার্থনার জন্য ৭ দিন সময় পাবেন না। আর ক্ষমা প্রার্থনা না করলে সরকারের নির্দেশে যে কোনো সময় কারা কর্তৃপক্ষ তার ফাঁসি কার্যকর করবে। রিভিউ খারিজের পর কাশিমপুর কারাগারে পরিবারের সদস্যরা সাক্ষাৎ করেন। একই দিনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সংবাদ মাধ্যমকে জানানো হয় নিজামী প্রাণভিক্ষার আবেদন করবেন না।
ক্ষমা চাওয়ার সময়সীমা প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘রিভিউ খারিজের বিষয়টি অফিসিয়ালি কারা কর্তৃপক্ষ জানবে। এরপর তা দণ্ডিত ব্যক্তিকে জানানো হবে। তখনই জানতে চাওয়া হবে তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কিনা। প্রাণভিক্ষা চাইলে তাকে সে সুযোগ দেয়া হবে। এক্ষেত্রে তিনি একটি যুক্তিসঙ্গত সময় পাবেন। আর না চাইলে সরকারের নির্দেশে তার ফাঁসি কার্যকর করা হবে।’ ফাঁসি কার্যকরের আগে পরিবারের সঙ্গে শেষ সাক্ষাতের সুযোগ পাবেন নিজামী।
আপিল বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার অরুনাভ চক্রবর্তী বলেন, রায়ের তিনটি অনুলিপি দেয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনালে। সেখান থেকে কারা কর্তৃপক্ষ ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের জন্য পাঠানো হবে। পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দু’পক্ষের আইনজীবীকেও অনুলিপি দেয়া হয়েছে।
একাত্তরে হত্যা, ধর্ষণ এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর নিজামীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের রায় দেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর ৬ জানুয়ারি সেই ফাঁসির রায়ই বহাল রাখেন সর্বোচ্চ আদালত। ১৫ মার্চ সুপ্রিমকোর্ট সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করেন আপিল বিভাগ। ওইদিনের শেষে ট্রাইব্যুনাল আপিলের রায়ের কপি হাতে পেয়ে নিজামীর মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেন। পরের দিন এ সংক্রান্ত নথি কাশিমপুর কারাগারে পৌঁছানোর পর নিজামীকে ওই মৃত্যু পরোয়ানা পড়ে শোনানো হয়। নিয়ম অনুযায়ী রিভিউ দায়েরের জন্য নিজামী ১৫ দিন সময় পান। এ সময় পর্যন্ত তার মৃত্যু পরোয়ানা কার্যকর স্থগিত থাকে। ২৯ মার্চ আপিলের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) জন্য আবেদন করেন নিজামী, যা ৫ মে বৃহস্পতিবার খারিজ হয়ে যায়।
সোমবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে রিভিউ খারিজের রায়ে সব বিচারপতি স্বাক্ষর শেষ করেন। ২২ পৃষ্ঠার রায়টি লিখেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। এতে একমত পোষণ করে স্বাক্ষর দিয়েছেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। সব বিচারপতির স্বাক্ষরের পর সেটি সুপ্রিমকোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। রায়ে বলা হয়েছে, একাত্তরের এসব অপরাধ ছিল চরমভাবে নিষ্ঠুর এবং বিভীষিকাময়। এসব জঘন্য অপরাধের কারণে একাত্তরে ক্ষতিগ্রস্তদের স্বজনরাই শুধু নয়, পুরো জাতি শোকাভূত। পুরো জাতি দীর্ঘদিন ধরে কুকর্মকারীদের সঠিক বিচারের আশায় অপেক্ষা করছে। এসব অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় নিজামীর একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এই শাস্তি কমানোর মতো বিশেষ কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব হয়নি। এই আপিলকারী একাত্তরে একাধিক নিষ্ঠুর ও অমানবিক অপরাধের সঙ্গে যুক্ত এবং তাকে ৫টি ভিন্ন অপরাধে ৫টি পৃথক শাস্তি দেয়া হয়েছে।
রায়ে আরও বলা হয়েছে, রিভিউকে আপিলের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। একটি রায়ের রিভিউ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। পূর্বে বিচারের সময় যদি কোনো বিষয় বাদ পড়ে যায়, বড় ধরনের ভুল হয় তাহলে এই রিভিউ পিটিশন গ্রহণযোগ্য। অন্যথায় আদালত এটা খতিয়ে দেখতে অনিচ্ছুক। উপরন্তু ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে আপিল বিভাগের রায় রিভিউয়ের কোনো বিধান নেই। ন্যায়বিচারের স্বার্থে আপিল বিভাগ শর্তসাপেক্ষে তার অন্তর্নিহিত ক্ষমতাবলে রিভিউ আবেদন গ্রহণযোগ্য বলেছেন। স্পষ্ট এবং বড় ধরনের কোনো ভুল হলে বিচারে ন্যায়ভ্রষ্টতা এড়াতে রিভিউ প্রয়োজন, অন্যক্ষেত্রে নয়। রায়ে আরও বলা হয়, নিজামী বৃশালিখার সোহরাব হত্যায় সরাসরি অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটাননি। নাখালপাড়ার এমপি হোস্টেলে বদি, রুমি, জুয়েল এবং আজাদকে হত্যার ক্ষেত্রেও উসকানি দিয়েছিলেন। মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার মতো কুকর্মের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার কথা নিজামী পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন। তার আইনজীবী সাজা কমানোর আবেদন করলেও নিজামী ওইসব অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয় অস্বীকার করেননি। রিভিউ আবেদনের কোনো যুক্তি না থাকায় তা খারিজ করা হয়।
রিভিউয়ের রায় প্রকাশের পর রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘রায়টি রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) হওয়ার মতো কোনো গ্রাউন্ড আপিল বিভাগ খুঁজে পাননি। বিশেষ করে, তার মৃত্যুদণ্ডকে পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করার প্রার্থনা ছিল। কিন্তু আদালত তা গ্রহণ করেননি।’
প্রস্তুত ফাঁসির মঞ্চ : কারা সূত্র জানিয়েছে, কাশিমপুর কারাগার থেকে রোববার রাতে নিজামীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়। তাকে রাখা হয়েছে কনডেম সেল-৮ রজনীগন্ধায়। কেন্দ্রীয় কারাগারে ঢোকানোর সময় তার আচরণ ছিল স্বাভাবিক। রোববার রাত, সোমবার সকাল ও দুপুরে স্বাভাবিকভাবেই খাবার খেয়েছেন তিনি। তবে রাতে মুরগির মাংস, রুটি খেতে দেয়া হলেও তিনি সেগুলো খাননি। রাতে সেলের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করতে থাকেন। তিনি বেশ চিন্তিত ছিলেন। রোববার রাত থেকেই কারাগারের ভেতরে ও বাইরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে রজনীগন্ধা সেলের সামনে অতিরিক্ত তিন কারারক্ষী দেয়া হয়েছে। কারাগারের পূর্ব-পশ্চিম কোণে অবস্থিত ৮ ফুট বাই সাড়ে ৪ ফুট ফাঁসির মঞ্চ ধুয়ে মুছে প্রস্তুত করা হচ্ছে। তৈরি করা হচ্ছে সম্ভাব্য জল্লাদদের নামের তালিকা। এবারের তালিকায় নতুন জল্লাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। নতুন জল্লাদ দিয়েই কার্যকর করা হতে পারে নিজামীর ফাঁসির রায়। ইতিমধ্যে নড়াইল কারাগার থেকে রাতে আবদুল ওহাব এবং ওমর আলী নামে দুই জল্লাদকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে আসা হয়।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্র জানায়, ৩৬ বর্গফুটের (৮ ফুট বাই সাড়ে ৪ ফুট) মঞ্চের ওপরে ফাঁসির কাষ্ঠের (মেটালিক) উচ্চতা ৮ ফুট। অন্যদিকে মঞ্চ থেকে নিচের দিকে ১২ ফুট গভীর গর্ত রয়েছে। কাঠের পাটাতন দিয়ে ঢাকা সেই গর্ত। ফাঁসিকাষ্ঠের লাগোয়া উত্তর দিকে আছে কপিকল গিয়ার। গিয়ারের দায়িত্বে থাকেন প্রধান জল্লাদ। তার পাশে পূর্বদিকে অবস্থান নেন আরও তিনজন। মূল মঞ্চসহ পুরো ফাঁসির মঞ্চটি আরও বড়। একটি লম্বা টেবিল থাকে, যার পাশে বসতে পারেন অন্তত ১০ জন। ফাঁসি কার্যকর করার সময় সতর্ক পাহারার জন্য অবস্থান নেয় অন্তত ১০ জন সশস্ত্র কারারক্ষী। সবার হাতে থাকে ভারি আগ্নেয়াস্ত্র।
নিজামীর বিচার : ২০১০ সালের ২৯ জুন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের একটি মামলায় মতিউর রহমান নিজামীকে গ্রেফতার করার পর একই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। ২০১২ সালের ২৮ মে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে জামায়াত আমীরের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়। তদন্ত কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক খানসহ প্রসিকিউশনের পক্ষে মোট ২৬ জন এ মামলায় সাক্ষ্য দেন। নিজামীর পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন তার ছেলে মো. নাজিবুর রহমানসহ মোট চারজন। বিচার শেষে ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল যে রায় দেন, এতে প্রসিকিউশনের আনা ১৬ অভিযোগের মধ্যে আটটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। এই আট অভিযোগের মধ্যে ২, ৪, ৬ ও ১৬ নম্বর ঘটনায় নিজামীর ফাঁসির রায় হয়। এছাড়া ১, ৩, ৭ ও ৮ নম্বর অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ২৩ নভেম্বর সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেন নিজামী। আপিলের রায় ঘোষণা হয় ২০১৬ সালের ৬ জানুয়ারি। আপিল বিভাগ তিনটি অভিযোগে তার ফাঁসির রায় বহাল রাখেন। শেষ ফাঁসি কার্যকর এই কারাগারে : নিজামী যদি প্রাণ ভিক্ষা চান এবং রাষ্ট্রপতি আবেদন খারিজ করে দেন তাহলে আজকালের মধ্যেই ফাঁসির রায় কার্যকর করা হবে। তার ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে নাজিম উদ্দিন রোডে কারাগারের শেষ ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হতে পারে। কারণ খুব শিগগির কারাগারটি স্থানান্তর করা হচ্ছে কেরানীগঞ্জে। এর আগে মানবতাবিরোধী অপরাধে চারজনকে নাজিম উদ্দিন রোডে (ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে) ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তারা হলেন, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী।

Print Friendly, PDF & Email